একদিকে ইউরোপের বাজারঘাটে যখন শুনশান নিস্তব্ধতা, অন্যদিকে তখন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে বিশৃঙ্খলার আওয়াজ। কী হয়েছে তৈরী পোশাক শিল্পে? কিছুদিন আগেও এটি ছিলো রমরমা ব্যবসায়।

ইউরোপীয় টেক্সটাইল সংস্থাগুলি যেমন সিএন্ডএ, এইচ এন্ড এম, জারা বা ট্যালি ওয়েইজল তাদের পোশাকের অর্ডার দিতো, বাংলাদেশের কারখানাগুলি সেই অনুযায়ী উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল কিনতো এবং পোশাক তৈরী করে সরবরাহ করে টাকা পেতো। গত মার্চে সারা দুনিয়ার মতো কোভিড-১৯ ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে টেক্সটাইল সংস্থাগুলি তাদের দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হয় এবং নাটকীয়ভাবে বিক্রয় কমে যায়। ফলস্বরূপ, তারা বাংলাদেশকে দেয়া অর্ডারগুলো বাতিল করে বা আটকে দেয়।

যদিও ইউরোপের শ্রমিকরা এ ধরণের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সহযোগীতা পায় এবং আংশিকভাবে তাদের বেতন পায়, কিন্তু বাংলাদেশের শ্রমিক কুলসুম তার অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যায়- “গরিবের বাঁচা মরা আল্লার হাতে। আমি যদি কাজে না যাই তবে আমাকে ঘরে বসে মারা যেতে হবে।”

ঢাকা শহরের একজন গার্মেন্টস শ্রমিক কুলসুম, কাজ করেন সামস এটায়ারে, যারা বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ড সি এন্ড এ এর জন্য জামা, প্যান্ট সহ নানা ধরণের পোশাক তৈরী করে। কুলসুমের স্বামী একজন রিকশা চালক। দুজনের আয়ে দুই সন্তান সহ চারজনের সংসার চলেনা বলে কুলসুমকে ঘন্টায় ৪৯ টাকার আশায় ওভারটাইম করতে হয় পুরো সপ্তাহেই। মার্চ মাসের শেষে সরকার সারা দেশে ১০ দিনের সরকারী ছুটি ঘোষনা করে, সে সময়ের অভিজ্ঞতা কুলসুম প্রকাশ করেন এভাবে- ‘আমার স্বামীর এখন আয় নাই, আমার আয় নাই ১ টাকাও, ওদিকে বাড়িওয়ালা প্রতিদিন ভাড়া চায়, ভয়ে আছি কোনদিন জেনো বাসা ছেড়ে বের হয়ে যেতে বলে, গরীবের মরা ছাড়া উপায় নাই’।

Poor people die at the will of the Almighty.

Kulsum (name changed), seamstress for C&A in Bangladesh


অন্যদিকে ঢাকা থেকে ৭০০০ কিলোমিটার দূরে সুইজারল্যান্ডের যুগ শহর, যেখানে সোফরা হোল্ডিং এর মুল অফিস, এই অফিসের কাজ হলো ২০০ বছরের সি এন্ড এ প্রতিষ্ঠানের মালিক ‘ব্রেনিঙ্কমায়ার’ পরিবারের সম্পত্তির হিসেব রাখা। এই পরিবারের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুধু এই একটি সি এন্ড এ প্রতিষ্ঠানেরই সম্পত্তি রয়েছে ১৫ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঙ্ক সমপরিমান। আর সে দেশের অষ্টম ধনী এই পরিবারটির মোট সম্পত্তি যে কত- তা সুইজারল্যান্ড কখনো প্রকাশ করে না।

মহামারী করোনা শুরু হবার পর সি এন্ড এ তাদের ইউরোপের ১৪০০ বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। মার্চ এর ২৩ তারিখ তাদের কর্মকর্তা মার্টিন ভ্যান ডের জি বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহকারীদের সাথে যোগাযোগ করে লিখিত ভাবে জুন পর্যন্ত তাদের সকল চুক্তি বাতিল করেন। আর যে পোশাকগুলো ইতোমধ্যেই সেলাই হয়ে গেছে সেগুলোকে ওয়্যারহাউজে রেখে দিতে বলেন। বাংলাদেশে শুধু সি এন্ড এ একাই বাতিল করে ১৬৬ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমানের অর্ডার। সুইডিশ কোম্পানী এইচ এন্ড এম বাতিল করে তাদের ১৭৮ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার।

Message from C&A to the producers in Bangladesh

(Original document, 23 March 2020)

Download

Publikationen
Beobachter, July 3, 2020
De Correspondent, July 22, 2020
REFLEKT (বাংলা), July 21, 2020
Dhaka Tribune, 22. Juli 2020
De Correspondent, 3. August 2020
The Correspondent, 4. September 2020

ইউরোপ ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা রিফ্লেক্ট এর অনুসন্ধানে দেখা যায়, মহামারী করোনার কারণে ফ্যাশন কোম্পানীগুলো বাংলাদেশে তাদের দেয়া প্রায় ৩.২ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল করে, যা ঝুঁকিতে ফেলেছে কুলসুমের মতো পোশাক শ্রমিক ও তাদের পরিবারের লাখ লাখ সদস্যের জীবন। যদিও বাংলাদেশ সরকার প্রনোদনা সাহায্য হিসেবে কারখানাগুলোকে ২ ভাগ সুদে ঋণ দেন যেখান থেকে শ্রমিকরা এপ্রিল মাসে তাদের বেতনের ৬০ ভাগ সমপরিমান টাকা পান, কিন্তু তবুও তা জীবন ধারণের জন্য অপর্যাপ্ত।

BGMEA database with cancelled and stopped orders
(Excel file, end of March 2020)

Download

এরপর মে মাস থেকে অল্প অল্প করে আবারো কারখানাগুলো চালু হয়। সি এন্ড এ তাদের ৯০ ভাগ অর্ডার পুনরায় বহাল করেন, কিন্তু ইউ এস ভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্কার্স রাইট করসোর্টিয়ামের নির্বাহি পরিচালক স্কট নোভা একটি হিসাব করে বলেন যে, ‘আবারো অর্ডারগুলো চালু হলেও সেখানে ২০-৩০ মিলিয়ন ডলারে একটি গ্যাপ রয়েছে’। সি এন্ড এ এর ২ থেকে ৩ মিলিয়নের ফান্ডের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না যা প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ হাজার শ্রমিকের বেতনের সমান। কিছু কিছু ফ্রাশন প্রতিষ্ঠান তাদের অর্ডার পুনর্বহাল করতে এক বছর পর্যন্ত বিলম্ব করতে চান, যে ব্যাপারে স্কট নোভা বলেন- ‘এই কোম্পানীগুলো যে এক বছর পরে তাদের পাওনা টাকা পরিশোধ করে পোশাকগুলো সংগ্রহ করবে- তার গ্যারান্টি কী?’।

সিএন্ডএ’র একজন মুখপাত্র বলেছেন: “সমস্ত পুরানো আদেশের সম্পূর্ণ উত্পাদন সম্ভব নয় এবং এটি কোনও অর্থবোধ করে না, কারণ অনেক সরবরাহকারী দেশগুলিতে উত্পাদন বেশ কয়েক সপ্তাহের জন্য পুরোপুরি ব্যাহত ছিল এবং বর্তমানে কেবলমাত্র একটি সীমিত মাত্রায় পুনরারম্ভের জন্য এটি সুরক্ষিত করতে পারে? কারখানা শ্রমিক”। 

তাছাড়াও ফ্যাশন কোম্পানীগুলো যে ‘ফোর্স মেজর’ নামক ধারার বরাত দিয়ে তাদের অর্ডারগুলো বাতিল করতে থাকেন। এটি একটি আইনী ধারা যার দ্বারা কোন অপ্রত্যাশিত ও নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতিতে তাদের অর্ডার বাতিল করতে পারেন। কিন্তু নিউ ইয়র্কের আইনজীবি এলেন বেহর এর বিরোধীতা করে করে বলেন- ‘প্যানডেমিক এর কারণে প্রাপ্য টাকা দেয়ার কোনো কথা অধিকাংশ ফোর্স মেজরে নেই’।

এ ব্যাপারে আকেটি জরুরী বিবেচ্য ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের জলবায়ুতে এই কাপরগুলো সংরক্ষণ করাও কারখানাগুলোর জন্য অত্যন্ত ব্যায়সাপেক্ষ বিষয়। আর এসমস্ত লোকসান ও ক্ষতি এড়াতে বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে বাধ্য হতে হচ্ছে শ্রমিক ছাটাই করতে ও মজুরীর পরিমান কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে। বাংলাদেশ টেক্সঠাইল ফেযারেশনের মোট সদস্য হলো ৪৫০০টি কারখানা। আর জুন মাস পর্যন্ত কারখানাগুলো মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মিলিয়ন ডলারের মজুরী ঘাটতি ছিলো। আর ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে এসকল পাওনা অর্থ আদায় ব্যতীত বাংলাদেশি কারখানার মালিকদের পক্ষে এসকল মজুরী দেয়া সম্ভব নয়।

বিজিএমইএ এর সভাপতি রুবানা হক বলেন- “এর কারণে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।” অবশ্য সকল টেক্সটাইল সংস্থা এজন্য সমানভাবে দায়ী নয়। কেউ কেউ তাদের অর্ডার বাতিল করলেও এখন পুনরায় অর্ডার দিচ্ছেন, কেউ তা স্থগিতই রাখছেন এবং কেউ কেউ এখনও তাদের বাধ্যবাধকতাগুলি পালন করতে অস্বীকার করছেন। রুবানা হক আরো বলেন- ‘যে কোম্পানীগুলো পাওনা টাকা দিচ্ছেনা অথবা এদেশের সরবরাহকারীদের সাথে যোগাযোগে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, আমরা তাদের নিয়ে একটি ব্ল্যাকলিস্ট করছি’।

Up to a million workers could be impacted.

Rubana Huq, president of the textile export association BGMEA


অন্যদিকে বাংলাদেশের কারখানার মালিকরা মামলাটি আদালতে নিতে ভয় পাচ্ছেন কারণ এতে তারা ভবিষ্যতে অর্ডার হারাতে পারে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এ বাজারে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলি তখন শুধু কারখানাই বদলাবে না, দেখা যাবে তাদের অর্ডারগুলো বদলে নিয়ে যেতে পারে অন্য দেশেও। জুলাই মাসে কারখানাগুলো আবারো কাজ শুরু করেছে পুরোদমে, কিন্তু যে ঘাটতি তৈরী হয়েছে, তা কি পূরণ করতে পারবে বাংলাদেশ?

This research was published on 3 July 2020 – at a time when current figures & company statements were still changing and numerous questions had to be left open.

The following organisations provide an updated overview of the behaviour of textile companies during the Covid-19 crisis:
Business & Human Rights Resource Centre: How did the companies officially communicate?
Workers Rights Consortium: Which companies have agreed to pay for orders that have been completed and were in production?

What remains unclear: What happens to the orders that were not yet in production? Are the companies keeping their promises and woll they, as announced, accept their orders? When will the postponed orders be paid? How does the postponement affect the business of 2021 and the Bangladeshi textile industry in general?

Some contributors to this research were supported by the European Journalism Covid-19 Support Fund.

Please go to the German version for the background materials.